আপনার ছোটবেলার বর্ষা কি আজকের বর্ষার মতোই ছিল? আগে আষাঢ় এলেই টানা বৃষ্টি, শীতের সকালে ঘন কুয়াশা আর গ্রীষ্মের নির্দিষ্ট ছন্দের কথা অনেকেই স্মরণ করেন। বর্তমানে বৃষ্টিপাতের ধরন, তাপমাত্রা ও ঋতুর বৈশিষ্ট্যে নানা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক তথ্যও পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রমাণ দেয়।
এই নিবন্ধে আমরা জানব জলবায়ু পরিবর্তনের সংজ্ঞা, আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্য, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং গ্রিনহাউস প্রভাবের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের ১০টি প্রধান কারণ, বাংলাদেশের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো আলোচনা করব। সবশেষে জানব জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয় সম্বন্ধে।
জলবায়ু পরিবর্তন কী?
জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change) বলতে কোনো অঞ্চল বা সমগ্র পৃথিবীর তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, বাতাসসহ বিভিন্ন জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তনকে বোঝায়।
এই পরিবর্তন এক-দুই দিনের ঘটনা নয়; সাধারণত কয়েক দশক বা তারও বেশি সময়ের প্রবণতা থেকে এটি বোঝা যায়। এর ফলে তাপপ্রবাহ বাড়তে পারে, বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে, হিমবাহ গলতে পারে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
পৃথিবীর জলবায়ু অতীতেও প্রাকৃতিক কারণে পরিবর্তিত হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ের দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের বৃদ্ধি। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড় ও শিল্পকারখানার বর্জ্য নির্গমনও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আবহাওয়া কী? আবহাওয়া ও জলবায়ু কি একই জিনিস?
আবহাওয়া (Weather) হলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো স্থানের বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা। আজ বৃষ্টি হচ্ছে কি না, দুপুরে কতটা গরম, বাতাসের গতি কেমন এসব আবহাওয়ার অংশ। এটি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বা দিনে দিনে বদলাতে পারে।
অন্যদিকে, জলবায়ু (Climate) হলো দীর্ঘ সময় ধরে কোনো অঞ্চলের আবহাওয়ার গড় অবস্থা, বৈচিত্র্য ও পুনরাবৃত্ত ধরন। জলবায়ু বিশ্লেষণে সাধারণত ৩০ বছর বা তার বেশি সময়ের তথ্য ব্যবহার করা হয়।
তাই আবহাওয়া ও জলবায়ু শব্দ দুটি কাছাকাছি মনে হলেও এদের অর্থ আলাদা।
ধরা যাক, কোনো শীতকালে বাংলাদেশে কয়েক দিন তীব্র শীত পড়ল। শুধু এই ঘটনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অস্বীকার করা যায় না। আবার কোনো একটি গ্রীষ্মে অস্বাভাবিক গরম পড়লেই সেটিকে এককভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রমাণ বলা যায় না। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময়ের তথ্য ও প্রবণতা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ১০টি প্রধান কারণ
জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ হলো মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। জ্বালানি ব্যবহার, বন উজাড়, কৃষিকাজ ও শিল্পায়ন, সবই কোনো না কোনোভাবে এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
চলুন, সহজ ও সাবলীল ভাষায় জেনে নেওয়া যাক, এর পেছনে থাকা ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কী এবং কেন সেগুলো জানা জরুরি।
১. জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো
কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানো জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, যানবাহন চালানো, রান্না এবং শিল্পকারখানা পরিচালনার জন্য এসব জ্বালানি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এগুলো পোড়ানোর ফলে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) বায়ুমণ্ডলে জমা হয় যা গ্রিনহাউস প্রভাবকে আরও তীব্র করে। ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্য ব্যাহত হয়। এর প্রভাবে তাপপ্রবাহ, হিমবাহ গলে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

Image Source: Livescience
মূল কারণ
কয়লা, পেট্রোল, ডিজেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বিদ্যুৎকেন্দ্র, যানবাহন, শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন যন্ত্র পরিচালনার জন্য এসব জ্বালানি পোড়ানো হয়।
কী নির্গত হয়?
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস।
- নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOₓ): জ্বালানি পোড়ানোর সময় নির্গত হয় এবং বায়ুদূষণ ও বায়ুমণ্ডলীয় রাসায়নিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
- সালফার ডাই–অক্সাইড (SO₂): বিশেষত সালফারযুক্ত কয়লা ও তেল পোড়ালে নির্গত হতে পারে এবং অ্যাসিড বৃষ্টির কারণ হতে পারে।
এগুলোর মধ্যে CO₂ দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান চালক।
কী প্রভাব পড়ে?
- পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত হয়।
- তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
- হিমবাহ ও স্থলভাগের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
- সমুদ্রের পানি বেশি CO₂ শোষণ করায় সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি পায়।
- বায়ুদূষণের কারণে মানুষের শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
করণীয়
- সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।
- অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রেখে বিদ্যুতের অপচয় কমানো।
- গণপরিবহন, সাইকেল ও হাঁটার অভ্যাস বাড়ানো এবং সম্ভব হলে পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবহার করা।
- বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
- সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ জোরদার করা।
২. বন উজাড় ও ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন
বন উজাড় ও ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কৃষিজমি তৈরি, বসতি স্থাপন, সড়ক নির্মাণ এবং শিল্পকারখানা গড়ে তোলার জন্য বনভূমি ধ্বংস করা হয়। গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে কার্বন সঞ্চয় করে। বন কেটে ফেলা বা পুড়িয়ে দেওয়ার ফলে সঞ্চিত কার্বনের একটি অংশ বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে। একই সঙ্গে কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।

Image Source: Pexels
মূল কারণ
কৃষিকাজ, বসতি ও শিল্প স্থাপন, কাঠ সংগ্রহ এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নির্বিচারে গাছ কাটা ও বনভূমিকে অন্য কাজে রূপান্তর করা।
কী নির্গত হয়?
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): গাছ পোড়ালে বা পচে গেলে সঞ্চিত কার্বনের একটি অংশ নির্গত হয়।
- মিথেন (CH₄): কিছু জলাবদ্ধ ভূমি বা পিটভূমির ব্যবহার পরিবর্তন ও অবক্ষয়ের ফলে নির্গত হতে পারে।
কী প্রভাব পড়ে?
- বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পায়।
- জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়।
- অনেক অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে।
- মাটির ক্ষয়, ভূমির অবক্ষয় এবং বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
করণীয়
- নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা এবং বন উজাড় নিয়ন্ত্রণ করা।
- বনভূমি পুনরুদ্ধার ও পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ করা।
- কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নে পরিবেশবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
- বন সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা এবং স্থানীয় জনগণকে বন রক্ষায় সম্পৃক্ত করা।
৩. কৃষিকাজ ও পশুপালন
কৃষিকাজ ও পশুপালন খাদ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য হলেও কিছু কৃষিপদ্ধতি জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। গরু ও ছাগলের মতো জাবরকাটা প্রাণীর পরিপাকপ্রক্রিয়ায় মিথেন নির্গত হয়। অন্যদিকে, ধানখেতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে জৈব পদার্থের পচনের ফলে মিথেন তৈরি হতে পারে। কৃষিজমিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেনযুক্ত সার ব্যবহার এবং গোবর ব্যবস্থাপনার কারণেও নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হয়। এসব গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায়।

Image Source: SGS
মূল কারণ
- গবাদিপশুর পরিপাকপ্রক্রিয়া ও গোবর ব্যবস্থাপনা।
- পানিতে নিমজ্জিত ধানখেতে জৈব পদার্থের পচন।
- কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার।
কী নির্গত হয়?
- মিথেন (CH₄): গবাদিপশুর পরিপাকপ্রক্রিয়া ও জলাবদ্ধ ধানখেত থেকে নির্গত হয়।
- নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O): নাইট্রোজেন সার ও গোবর থেকে নির্গত হয়।
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): কৃষিযন্ত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং কৃষির জন্য বনভূমি পরিষ্কারের ফলে নির্গত হতে পারে।
কী প্রভাব পড়ে?
- বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পায়।
- তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
- কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
করণীয়
- প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করা।
- উন্নত পশুখাদ্য ও কার্যকর গোবর ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা।
- ধান চাষে উপযুক্ত ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে জমি শুকানো ও পানি দেওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করা।
- কৃষিজমি সম্প্রসারণের জন্য বন উজাড় বন্ধ করা।
৪. শিল্পায়ন ও সিমেন্ট উৎপাদন
শিল্পায়ন ও সিমেন্ট উৎপাদন জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। শিল্পকারখানায় জ্বালানি পোড়ানো এবং সিমেন্ট তৈরির সময় প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। বিশেষ করে সিমেন্ট উৎপাদনে চুনাপাথরকে উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করার ফলে CO₂ নির্গত হয়। এসব গ্যাস বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায়।

Image Source: Pexels
মূল কারণ
শিল্পকারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং সিমেন্ট তৈরির রাসায়নিক প্রক্রিয়া।
কী নির্গত হয়?
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): জ্বালানি পোড়ানো ও চুনাপাথর প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে নির্গত হয়।
কী প্রভাব পড়ে?
- বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পায়।
- বায়ুদূষণ বাড়ে।
- জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি তীব্র হয়।
করণীয়
- জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
- নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
- কম কার্বন নিঃসরণকারী সিমেন্ট উৎপাদনপ্রযুক্তি গ্রহণ করা।
৫. যানবাহন ও পরিবহনব্যবস্থা
গাড়ি, বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মতো যানবাহনে পেট্রোল ও ডিজেল পোড়ানোর ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। শহরে যানজট এবং ব্যক্তিগত গাড়ির অতিরিক্ত ব্যবহার জ্বালানি খরচ ও নির্গমন বাড়াতে পারে। এসব যানবাহন থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখে।

Image Source: Pexels
মূল কারণ
জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহনের অতিরিক্ত ব্যবহার, যানজট এবং জ্বালানির অপচয়।
কী নির্গত হয়?
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত হয়।
- নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOₓ): বায়ুদূষণে ভূমিকা রাখে।
কী প্রভাব পড়ে?
- বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পায়।
- শহরে বায়ুদূষণ ও ধোঁয়াশা বাড়ে।
- মানুষের শ্বাসতন্ত্রের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
করণীয়
- গণপরিবহন ব্যবহার ও কারপুলিং বাড়ানো।
- অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো।
- বৈদ্যুতিক যানবাহন ও পরিচ্ছন্ন পরিবহনব্যবস্থা উৎসাহিত করা।
- যানবাহনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
৬. বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা
যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। গৃহস্থালি ও বাজারের খাবারের উচ্ছিষ্টসহ জৈব বর্জ্য খোলা স্থানে বা ভাগাড়ে জমে থাকলে অক্সিজেনের অভাবে পচনের সময় মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। আবার বর্জ্য পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য বায়ুদূষক নির্গত হতে পারে। এসব গ্যাস বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায় এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।

Image Source: Pexels
মূল কারণ
- খোলা স্থানে বর্জ্য ফেলা।
- জৈব বর্জ্য আলাদা না করা।
- অপরিকল্পিত ভাগাড়ে বর্জ্য জমা ও পোড়ানো।
কী নির্গত হয়?
- মিথেন (CH₄): জৈব বর্জ্য পচনের ফলে তৈরি হয়।
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): বর্জ্য পোড়ানো ও পরিবহনে জ্বালানি ব্যবহারের ফলে নির্গত হয়।
কী প্রভাব পড়ে?
- বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পায়।
- বায়ু ও পানিদূষণ ঘটে।
- দুর্গন্ধ ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
করণীয়
- বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানো।
- জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করা।
- খোলা স্থানে বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা।
- বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা।
৭. অপরিকল্পিত নগরায়ণ
অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে গাছপালা ও খোলা জমির পরিবর্তে কংক্রিটের ভবন, পিচঢালা রাস্তা এবং পার্কিং এলাকা বৃদ্ধি পায়। এসব পৃষ্ঠ তাপ শোষণ ও ধরে রাখে, ফলে শহর আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় বেশি উষ্ণ হয়ে উঠতে পারে। একে নগর তাপদ্বীপ প্রভাব (Urban Heat Island Effect) বলে। এ ছাড়া শহরের নির্মাণকাজ, পরিবহন ও বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনও বাড়তে পারে।

Image Source: Pexels
মূল কারণ
- অপরিকল্পিত ভবন ও সড়ক নির্মাণ।
- গাছপালা ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়া।
- যানবাহন ও বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি।
কী নির্গত হয়?
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): নির্মাণকাজ, পরিবহন ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে নির্গত হয়।
কী প্রভাব পড়ে?
- শহরে তাপমাত্রা ও গরমের অস্বস্তি বাড়ে।
- শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার ও বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
- জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনও বাড়তে পারে।
করণীয়
- পরিকল্পিত নগরায়ণ ও সবুজ এলাকা বৃদ্ধি করা।
- ছাদবাগান ও বৃক্ষরোপণ উৎসাহিত করা।
- গণপরিবহন ও জ্বালানি সাশ্রয়ী ভবন নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া।
৮. অতিরিক্ত ভোগ ও শক্তির অপচয়
প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন ও কেনাকাটা, পণ্য দ্রুত ফেলে দেওয়া এবং বিদ্যুতের অপচয়ের ফলে জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের চাহিদা বাড়ে। পণ্য উৎপাদন, প্যাকেজিং ও পরিবহনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হলে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নির্গত হয়। একইভাবে, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্গমন বাড়তে পারে। তাই অপচয় কমানো ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।

Image Source: Pexels
মূল কারণ
- অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা ও দ্রুত ফেলে দেওয়া।
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয়।
- একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের অতিরিক্ত ব্যবহার।
কী নির্গত হয়?
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): পণ্য উৎপাদন, পরিবহন ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে নির্গত হয়।
কী প্রভাব পড়ে?
- গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বৃদ্ধি পায়।
- প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ে।
- বর্জ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
করণীয়
- অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও বিদ্যুতের অপচয় কমানো।
- পণ্য পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা।
- দীর্ঘস্থায়ী ও জ্বালানি সাশ্রয়ী পণ্য ব্যবহার করা।
৯. প্রাকৃতিক কার্বন শোষণব্যবস্থার দুর্বলতা
বন, মাটি ও সমুদ্র বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) শোষণ করে জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। কিন্তু বন উজাড়, দাবানল ও ভূমির অবক্ষয়ের কারণে প্রাকৃতিক কার্বন শোষণক্ষমতা কমে যেতে পারে। বন পুড়ে গেলে গাছের সঞ্চিত কার্বনের একটি অংশ বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে। অন্যদিকে, সমুদ্র অতিরিক্ত CO₂ শোষণ করলে পানির অম্লতা বাড়ে যা সামুদ্রিক জীবের জন্য ক্ষতিকর। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।

Image Source: Pexels
মূল কারণ
- বন উজাড় ও দাবানল।
- মাটির জৈব পদার্থের ক্ষয়।
- বন ও জলাভূমির মতো প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয়।
কী নির্গত হয়?
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): বন পোড়া ও সঞ্চিত কার্বন মুক্ত হওয়ার ফলে নির্গত হয়।
কী প্রভাব পড়ে?
- বায়ুমণ্ডলে CO₂ জমার পরিমাণ বাড়তে পারে।
- জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধির ফলে সামুদ্রিক জীব ঝুঁকিতে পড়ে।
করণীয়
- বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ করা।
- ক্ষয়প্রাপ্ত বন ও ভূমি পুনরুদ্ধার করা।
- দাবানল প্রতিরোধ ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
১০. প্রাকৃতিক কারণ: সূর্য, আগ্নেয়গিরি ও সমুদ্রের পরিবর্তন
পৃথিবীর জলবায়ু প্রাকৃতিক কারণেও পরিবর্তিত হয়। সূর্যের শক্তির ওঠানামা, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং এল নিনো ও লা নিনার মতো সমুদ্রের প্রাকৃতিক চক্র তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে। বড় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া সালফেট কণা সাময়িকভাবে পৃথিবীকে শীতল করতে পারে। তবে বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস।

Image Source: Pexels
মূল কারণ
- সূর্যের শক্তির স্বাভাবিক ওঠানামা।
- আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত।
- এল নিনো ও লা নিনার মতো সমুদ্রের প্রাকৃতিক চক্র।
কী নির্গত হয়?
- কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত হতে পারে।
- সালফার ডাই–অক্সাইড (SO₂): আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় নির্গত হয় এবং বায়ুমণ্ডলে সালফেট কণা তৈরি করতে পারে।
কী প্রভাব পড়ে?
- সাময়িকভাবে বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক তাপমাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে।
- বৃষ্টিপাত, খরা ও আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
- কৃষি ও পানিসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
করণীয়
- প্রাকৃতিক জলবায়ুগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা।
- দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতি জোরদার করা।
- মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলো কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত?
উপরের কারণগুলোকে আলাদা করে আলোচনা করা গেলেও বাস্তবে এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ধরা যাক, একটি বন কেটে শিল্পাঞ্চল তৈরি করা হলো। এতে গাছের মাধ্যমে CO₂ শোষণের সুযোগ কমল। এরপর সেখানে কারখানা চালাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রয়োজন হলো। কারখানার পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক চলল। নির্মাণকাজে সিমেন্ট ব্যবহার করা হলো। ফলে একই উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে ভূমি ব্যবহার, জ্বালানি, শিল্প ও পরিবহন একাধিক খাতের নিঃসরণ যুক্ত হতে পারে।
আরও একটি বিষয় হলো প্রতিক্রিয়াশীল চক্র (Feedback Loop)। পৃথিবী উষ্ণ হলে কিছু অঞ্চলে বরফ গলে যায়। বরফের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ সূর্যালোক প্রতিফলিত করে, কিন্তু গাঢ় সমুদ্র বা ভূমি তুলনামূলক বেশি শক্তি শোষণ করে। এতে আরও উষ্ণায়ন ঘটতে পারে।
এ ধরনের প্রক্রিয়া দেখায় যে জলবায়ু একটি জটিল ব্যবস্থা। তাই সমাধানও একক কোনো পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ নয়; জ্বালানি, বন, কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও নগর পরিকল্পনা সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পরিবর্তন দরকার।
গ্রিনহাউস প্রভাব কী? পৃথিবীর তাপ আটকে থাকে কীভাবে?
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ বোঝার জন্য গ্রিনহাউস প্রভাব সম্পর্কে জানা দরকার।
শীতের রাতে কম্বল গায়ে দিলে শরীরের তাপ সহজে বেরিয়ে যেতে পারে না। ফলে আপনি উষ্ণ থাকেন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কিছু গ্যাসও অনেকটা একইভাবে পৃথিবী থেকে নির্গত তাপের একটি অংশ শোষণ করে আবার বিভিন্ন দিকে বিকিরণ করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় গ্রিনহাউস প্রভাব (Greenhouse Effect)।
সূর্য থেকে আসা শক্তি পৃথিবীর পৃষ্ঠকে উষ্ণ করে। পৃথিবী সেই শক্তির একটি অংশ অবলোহিত বিকিরণ হিসেবে মহাকাশে ফেরত পাঠায়। বায়ুমণ্ডলের গ্রিনহাউস গ্যাস এই বিকিরণের কিছু অংশ শোষণ করে, ফলে পৃথিবীর পৃষ্ঠ ও নিম্ন বায়ুমণ্ডল তুলনামূলক উষ্ণ থাকে।
এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া না থাকলে পৃথিবী মানুষের পরিচিত জীবনধারণের উপযোগী থাকত না। সমস্যা তৈরি হয় যখন মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং পৃথিবী থেকে তাপ বেরিয়ে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আরও বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাসগুলো কী কী?
১. কার্বন ডাই–অক্সাইড (CO₂): কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানো এবং বন উজাড়ের ফলে এর পরিমাণ বাড়ে। বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস।
২. মিথেন (CH₄): গবাদিপশুর হজম প্রক্রিয়া, ধানক্ষেত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন ও পরিবহনের সময় মিথেন নির্গত হয়। বায়ুমণ্ডলে এটি তুলনামূলক কম সময় থাকলেও স্বল্প সময়ের হিসাবে প্রতি একক ভরে CO₂-এর চেয়ে বেশি তাপ ধরে রাখতে পারে।
৩. নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O): কৃষিতে নাইট্রোজেন সার ব্যবহার, কিছু শিল্পপ্রক্রিয়া এবং জ্বালানি পোড়ানোর ফলে এই গ্যাস নির্গত হয়।
৪. ফ্লুরিনযুক্ত কিছু গ্যাস: রেফ্রিজারেশন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন শিল্পপ্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কিছু গ্যাস শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে কাজ করে।
জলীয় বাষ্পও একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনহাউস গ্যাস। তবে বর্তমান উষ্ণায়নের ক্ষেত্রে এটি প্রধানত একটি প্রতিক্রিয়াশীল উপাদান,পৃথিবী উষ্ণ হলে বায়ুমণ্ডলে আরও জলীয় বাষ্প থাকতে পারে যা উষ্ণায়নকে আরও বাড়ায়।
বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থ কী?
বাংলাদেশ নদী, কৃষি ও দীর্ঘ উপকূলরেখার দেশ। এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকাংশে কৃষি, মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তাই জলবায়ু পরিবর্তন শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; এটি খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, বসতি ও অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
১. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় ঝুঁকি
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বাংলাদেশের নিচু উপকূলীয় এলাকায় প্লাবন, লবণাক্ততা ও ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে এসব প্রভাব যুক্ত হলে উপকূলের মানুষের বসতি ও জীবিকা আরও ঝুঁকিতে পড়ে।
২. কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা
তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা ও মাটির লবণাক্ততা ফসল উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি কৃষিজমি ও মিঠাপানির উৎসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তবে এর প্রভাব অঞ্চল, ফসল ও কৃষিপদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্ন হয়।
৩. তাপপ্রবাহ ও জনস্বাস্থ্য
অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা ও তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে। কৃষক, নির্মাণশ্রমিক এবং দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করা মানুষ বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
৪. বন্যা, অতিবৃষ্টি ও পানির সংকট
অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের কারণে কোথাও বন্যা, আবার কোথাও পানির সংকট দেখা দিতে পারে। নদীর প্রবাহ, উজানের বৃষ্টিপাত ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাও এসব সমস্যাকে প্রভাবিত করে। তাই আগাম সতর্কতা, উন্নত নিষ্কাশন এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
৫. বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকার অনিশ্চয়তা
বারবার দুর্যোগ, জমির ক্ষতি ও লবণাক্ততার কারণে কিছু মানুষ জীবিকার সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের একটি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১ কোটি ৩৩ লাখ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ জলবায়ু-অভিবাসী তৈরি হতে পারে। এটি একটি মডেলভিত্তিক অনুমান, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ সংখ্যা নয়।
বাংলাদেশ দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ও ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই সক্ষমতা আরও বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও অবকাঠামো গড়ে তোলা ভবিষ্যতের ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রচলিত ভুল ধারণা: মিথ বনাম সত্য
মিথ ১: “এবার তো শীত বেশি, তাহলে পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে কীভাবে?”
সত্য: কোনো একটি দিনের বা মৌসুমের আবহাওয়া দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক প্রবণতা নির্ধারণ করে না। কোনো অঞ্চলে ঠান্ডা পড়লেও পৃথিবীর সামগ্রিক গড় তাপমাত্রা বাড়তে পারে। জলবায়ু বুঝতে বহু বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়।
মিথ ২: “পৃথিবীর জলবায়ু তো আগেও বদলেছে, এখনকার পরিবর্তনও প্রাকৃতিক।”
সত্য: অতীতে প্রাকৃতিক কারণে জলবায়ু পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসকে শনাক্ত করেছেন। অতীতের পরিবর্তন বর্তমানের কারণকে অস্বীকার করে না।
মিথ ৩: “বাংলাদেশের নিঃসরণ কম, তাই আমাদের কিছু করার নেই।”
সত্য: বাংলাদেশের বৈশ্বিক নিঃসরণে অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা করা দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, শক্তির দক্ষ ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্যও উপকারী।
মিথ ৪: “একজন মানুষ কী–ই বা করতে পারে?”
সত্য: ব্যক্তিগত অভ্যাস পরিবর্তন উপকারী, কিন্তু একা ব্যক্তির পক্ষে পুরো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কার্যকর পরিবর্তনের জন্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, সরকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সব পর্যায়ে উদ্যোগ প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কী করা যায়?
জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধানে দুটি ধারণা গুরুত্বপূর্ণ: প্রশমন (Mitigation) এবং অভিযোজন (Adaptation)।
প্রশমন মানে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো বা কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক সক্ষমতা বাড়ানো। অভিযোজন মানে জলবায়ুর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ক্ষতি কমানো।
ব্যক্তি পর্যায়ে করণীয়
- অপ্রয়োজনে বাতি, ফ্যান ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালু না রাখা।
- সম্ভব হলে গণপরিবহন, হাঁটা বা সাইকেল ব্যবহারের সুযোগ নেওয়া।
- খাবারের অপচয় কমানো এবং বর্জ্য আলাদা করে ব্যবস্থাপনা করা।
- প্রয়োজনীয় পণ্য দীর্ঘদিন ব্যবহার করা, মেরামত করা ও পুনর্ব্যবহারের সুযোগ কাজে লাগানো।
- গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান গাছ ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা।
সমাজ ও রাষ্ট্রের পর্যায়ে করণীয়
- নবায়নযোগ্য শক্তি এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
- বন, জলাভূমি ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করা।
- কৃষিতে পানি ও সারের দক্ষ ব্যবহার উৎসাহিত করা।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও গণপরিবহন উন্নত করা।
- তাপপ্রবাহ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো জোরদার করা।
- বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে জলবায়ুনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।
শুধু গাছ লাগানো বা প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোই যথেষ্ট নয়। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন ও শক্তি ব্যবস্থার পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিষ্কর্ষ
জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়। এর সঙ্গে আমাদের খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, বসতি, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাত্রা জড়িত।
বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো ও গ্রিনহাউস গ্যাসের বৃদ্ধি। এর পাশাপাশি বন উজাড়, কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বর্জ্য এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া জলবায়ুকে প্রভাবিত করলেও বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নকে শুধু প্রাকৃতিক কারণে ব্যাখ্যা করা যায় না।
সমস্যার ব্যাপ্তি বড়, তাই সমাধানের জন্যও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিচ্ছন্ন শক্তি, বন সংরক্ষণ, টেকসই কৃষি, উন্নত নগর পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল উৎপাদন এবং কার্যকর জলবায়ুনীতি সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে।
আমাদের লক্ষ্য শুধু অতীতের আবহাওয়া ফিরিয়ে আনার চেষ্টা নয়; বরং ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো, মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা এবং পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য রাখা।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন কি একই?
না। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে বোঝায়। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ছাড়াও বৃষ্টিপাতের ধরন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং চরম আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত।
গ্রিনহাউস প্রভাব কীভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটায়?
গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবী থেকে নির্গত তাপের একটি অংশ শোষণ করে। মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়ে গেলে অতিরিক্ত তাপ আটকে থাকে যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায়।
জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে আমরা কী করতে পারি?
বিদ্যুতের অপচয় কমানো, গণপরিবহন ব্যবহার, বন সংরক্ষণ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা করে। পাশাপাশি, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমাতে সরকার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তন কি প্রাকৃতিক কারণে ঘটে?
পৃথিবীর জলবায়ু প্রাকৃতিক কারণেও পরিবর্তিত হয়, যেমন সূর্যের শক্তির ওঠানামা, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং এল নিনো। তবে বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস কোনটি?
বর্তমান মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান চালক হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)। কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানো এবং বন উজাড়ের ফলে বায়ুমণ্ডলে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে কেন?
বাংলাদেশের নিচু উপকূলীয় অঞ্চল, দীর্ঘ উপকূলরেখা, ঘনবসতি এবং কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা দেশটিকে জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখে ফেলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, বন্যা ও তাপপ্রবাহ এই ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
শুধু গাছ লাগালেই কি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা সম্ভব?
না। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সাহায্য করে। তবে কার্যকরভাবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার, বন সংরক্ষণ এবং শিল্প ও পরিবহন খাতে নির্গমন হ্রাসও জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তন কি ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ায়?
জলবায়ু পরিবর্তন কিছু চরম আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি বাড়াতে পারে। উষ্ণ সমুদ্র ঘূর্ণিঝড়ের বৃষ্টিপাত ও তীব্রতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে, আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় প্লাবনের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার কারণ ও তীব্রতা একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।











