মহাকর্ষ বল কাকে বলে? ভর, দূরত্ব ও আকর্ষণের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা

আপনি একটি বল ওপরে ছুড়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর সেটি মাটিতে ফিরে এল। অথচ প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরের চাঁদ পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে না, বরং পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরতে থাকে। কখনো ভেবে দেখেছেন, বলটি মাটিতে ফিরে আসে, অথচ চাঁদ কেন এভাবে ঘুরতেই থাকে? ঘটনা দুটি আপাতদৃষ্টিতে আলাদা হলেও এদের পেছনে কাজ করছে একই প্রাকৃতিক আকর্ষণ, যার নাম মহাকর্ষ বল।
এই নিবন্ধে আমরা মহাকর্ষ বল কাকে বলে, এর বৈশিষ্ট্য কী এবং নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র কীভাবে কাজ করে তা আলোচনা করব। পাশাপাশি জানব, ভর ও দূরত্বের পরিবর্তনে এই বল কীভাবে বদলায় এবং মহাকর্ষ ও অভিকর্ষের মধ্যে পার্থক্য কোথায়।
মহাকর্ষ বল কাকে বলে?
মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি ভরযুক্ত বস্তু পরস্পরকে যে আকর্ষণ বল দিয়ে টানে তাকে মহাকর্ষ বল বলে। নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানে এই আকর্ষণ সব ভরযুক্ত বস্তুর মধ্যে কাজ করে। বস্তু দুটিকে বিন্দু ভর হিসেবে বিবেচনা করলে বলের দিক হয় তাদের সংযোগকারী সরলরেখা বরাবর।
পৃথিবীর টানে যেমন ছেড়ে দেওয়া বল মাটিতে পড়ে, তেমনি বলটিও পৃথিবীকে নিজের দিকে টানে। এই দুই আকর্ষণ বলের মান সমান, কিন্তু পৃথিবীর ভর বিপুল বলে তার ত্বরণ হয় অতি সামান্য। তাই আমরা বলটিকে পড়তে দেখি, পৃথিবীর নড়াচড়া টের পাই না।
এমনকি পাশাপাশি রাখা দুটি বইও পরস্পরকে আকর্ষণ করে। তবে তাদের ভর কম হওয়ায় এই আকর্ষণ অত্যন্ত ক্ষুদ্র,সাধারণ অবস্থায় ঘর্ষণের কারণে বই দুটি একে অন্যের দিকে এগিয়ে যায় না। অর্থাৎ, মহাকর্ষ শুধু পৃথিবী বা বড় জ্যোতিষ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়,ছোট-বড় সব ভরযুক্ত বস্তুর মধ্যেই এই পারস্পরিক আকর্ষণ রয়েছে।
মহাকর্ষ বলের প্রধান বৈশিষ্ট্য
নিউটনের সূত্র অনুযায়ী মহাকর্ষ বলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো:
- আকর্ষণধর্মী: দুটি ভর পরস্পরকে টানে।
- পারস্পরিক: একটি বস্তু অন্যটিকে আকর্ষণ করলে দ্বিতীয়টিও প্রথমটিকে সমান মানের, বিপরীতমুখী বল দিয়ে আকর্ষণ করে।
- ভরনির্ভর: দূরত্ব অপরিবর্তিত থাকলে ভরের গুণফল যত বাড়ে, বলও তত বাড়ে।
- দূরত্বনির্ভর: ভর অপরিবর্তিত থাকলে দূরত্বের বর্গের অনুপাতে বল কমে।
- সংযোগরেখা বরাবর কার্যকর: বিন্দু ভরের ক্ষেত্রে বলের দিক দুই ভরকে সংযোগকারী সরলরেখা বরাবর।
- স্পর্শ ছাড়াই কার্যকর: পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ না থাকলেও মহাকর্ষ কাজ করে।
এখানে “সমান বল” কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবী বলটিকে যত জোরে টানে, বলটিও পৃথিবীকে তত জোরে টানে। কিন্তু সমান বল মানেই সমান ত্বরণ নয়। পৃথিবীর ভর অত্যন্ত বেশি বলে একই বলের কারণে তার ত্বরণ হয় অতি সামান্য।
নিউটনের সর্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র
নিউটনের সর্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী, দুটি বস্তুর মধ্যকার আকর্ষণ বল তাদের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
সহজভাবে বললে, দূরত্ব একই রেখে একটি বস্তুর ভর দ্বিগুণ করলে আকর্ষণ বলও দ্বিগুণ হয়। আবার ভর একই রেখে দূরত্ব দ্বিগুণ করলে বল কমে আগের এক-চতুর্থাংশ হয়।
সূত্রটি হলো:

সূত্রের প্রতীকগুলোর অর্থ:
- F = দুটি বস্তুর মধ্যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল
- G = সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক
- m1 = প্রথম বস্তুর ভর
- m2 = দ্বিতীয় বস্তুর ভর
- r = বস্তু দুটির ভরকেন্দ্রের মধ্যবর্তী দূরত্ব
সূত্রটি সরাসরি বিন্দু ভরের জন্য প্রযোজ্য। পরস্পরের বাইরে থাকা দুটি গোলীয় প্রতিসম বস্তুর ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহার করা যায়; তখন (r) হলো তাদের কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রের দূরত্ব।
মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের আনুমানিক মান:
G = 6.674 × 10⁻¹¹ Nm²/kg²
(G)-এর মান খুব ছোট বলে দৈনন্দিন দূরত্বে অল্প ভরের দুটি বস্তুর মধ্যকার আকর্ষণও অত্যন্ত ক্ষুদ্র হয়। কিন্তু পৃথিবীর মতো বিশাল ভরের বস্তুর আকর্ষণ আমরা সহজেই অনুভব করি।
দূরত্ব বলতে কোথা থেকে কোথা পর্যন্ত?
মহাকর্ষ সূত্রে (r) কোন দূরত্ব বোঝায়, তা জানা জরুরি। বস্তু দুটিকে বিন্দু ভর ধরলে (r) হলো তাদের মধ্যকার দূরত্ব। আর পরস্পরের বাইরে থাকা দুটি গোলীয় প্রতিসম বস্তুর ক্ষেত্রে এটি হলো একটির কেন্দ্র থেকে অন্যটির কেন্দ্রের দূরত্ব।
যেমন, পৃথিবীকে গোলীয় প্রতিসম ধরে তার পৃষ্ঠ থেকে (h) উচ্চতায় থাকা একটি ছোট বস্তুর জন্য:
[r = R + h]
এখানে (R) হলো পৃথিবীর ব্যাসার্ধ এবং (h) হলো ভূপৃষ্ঠ থেকে বস্তুটির উচ্চতা। অর্থাৎ, সূত্রে শুধু উচ্চতা বসালে হবে না; পৃথিবীর ব্যাসার্ধের সঙ্গে উচ্চতা যোগ করতে হবে।
তবে অনিয়মিত আকৃতির বড় বস্তুর খুব কাছে আকর্ষণ হিসাব করতে শুধু কেন্দ্রের দূরত্ব যথেষ্ট নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বস্তুটির ভর কীভাবে ছড়িয়ে আছে, তা বিবেচনা করতে হয়।
ভর বাড়লে মহাকর্ষ বল কতটা বাড়ে?
দুটি বস্তুর মধ্যকার দূরত্ব একই থাকলে মহাকর্ষ বল তাদের ভরের গুণফলের সমানুপাতে বাড়ে। গাণিতিকভাবে:
F ∝ m₁ × m₂
অর্থাৎ, একটি বস্তুর ভর দ্বিগুণ করলে এবং অন্যটির ভর একই রাখলে আকর্ষণ বল দ্বিগুণ হয়। আর দুটি বস্তুর ভরই দ্বিগুণ করলে বল হয় (2×2=4) গুণ।
| ভরের পরিবর্তন | নতুন মহাকর্ষ বল |
| একটি ভর দ্বিগুণ, অন্যটি অপরিবর্তিত | আগের ২ গুণ |
| একটি ভর তিন গুণ, অন্যটি অপরিবর্তিত | আগের ৩ গুণ |
| দুটি ভরই দ্বিগুণ | আগের ৪ গুণ |
| একটি ভর অর্ধেক, অন্যটি অপরিবর্তিত | আগের অর্ধেক |
| একটি ভর দ্বিগুণ, অন্যটি অর্ধেক | অপরিবর্তিত |
শেষের ক্ষেত্রে,একটি ভর বাড়লেও অন্যটি কমায় তাদের গুণফল একই থাকে। তাই আকর্ষণ বলও বদলায় না।
মনে রাখতে হবে, এই তুলনাগুলোতে দূরত্ব অপরিবর্তিত ধরা হয়েছে। ভর ও দূরত্ব একসঙ্গে বদলালে উভয়ের প্রভাব হিসাব করতে হবে।
দূরত্ব বাড়লে মহাকর্ষ বল কীভাবে কমে?
বস্তু দুটির ভর অপরিবর্তিত থাকলে তাদের মধ্যকার মহাকর্ষ বল কেন্দ্রদ্বয়ের দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ,

এখানে (F) হলো মহাকর্ষ বল এবং (r) হলো বস্তু দুটির কেন্দ্রের মধ্যকার দূরত্ব। এই সম্পর্ককে ব্যস্তবর্গের নিয়ম বলে।
সহজভাবে বললে, দূরত্ব যত গুণ বাড়ে, মহাকর্ষ বল সেই সংখ্যার বর্গ দিয়ে ভাগ হয়ে যায়। যেমন, দূরত্ব দ্বিগুণ হলে বল অর্ধেক নয়, আগের এক-চতুর্থাংশ হয়। কারণ দূরত্বের বর্গ তখন (2^2 = 4) গুণ হয়।
| কেন্দ্রদ্বয়ের দূরত্ব | নতুন মহাকর্ষ বল |
| আগের ২ গুণ | আগের বলের ১/৪ অংশ |
| আগের ৩ গুণ | আগের বলের ১/৯ অংশ |
| আগের ৪ গুণ | আগের বলের ১/১৬ অংশ |
| আগের অর্ধেক | আগের বলের ৪ গুণ |
অর্থাৎ,দূরত্ব বাড়লে মহাকর্ষ বল কমে, আর দূরত্ব কমলে বল বাড়ে,উভয় ক্ষেত্রেই পরিবর্তনটি ঘটে দূরত্বের বর্গ অনুযায়ী।
ভর ও দূরত্ব একসঙ্গে বদলালে কী হবে?
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী, মহাকর্ষ বল ভর দুটির গুণফলের সমানুপাতিক এবং কেন্দ্রদ্বয়ের দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
ভর ও দূরত্ব একসঙ্গে বদলালে বলের পরিবর্তন বের করার সহজ নিয়ম হলো:
নতুন বল / আগের বল = (প্রথম ভরের নতুন মান / আগের মান) × (দ্বিতীয় ভরের নতুন মান / আগের মান) × (আগের দূরত্ব / নতুন দূরত্ব)²
ধরা যাক, বস্তু দুটির প্রতিটির ভর দ্বিগুণ করা হলো এবং কেন্দ্রদ্বয়ের দূরত্বও দ্বিগুণ করা হলো। তাহলে,
নতুন বল / আগের বল
= ২ × ২ × (১/২)²
= ৪ × ১/৪
= ১
অর্থাৎ, নতুন বল আগের বলের সমান মহাকর্ষ বল অপরিবর্তিত থাকবে।
কারণ, প্রতিটি ভর দ্বিগুণ করলে ভরের গুণফল ৪ গুণ হয়। শুধু এই পরিবর্তন ঘটলে বলও ৪ গুণ হতো। কিন্তু দূরত্বও দ্বিগুণ হওয়ায় সেই বল আবার ৪ দিয়ে ভাগ হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত বলের মান আগের সমান থাকে।
একটি সহজ গাণিতিক উদাহরণ
ধরা যাক, দুটি গোলীয় প্রতিসম বস্তুর ভর যথাক্রমে ১০ কিলোগ্রাম ও ২০ কিলোগ্রাম। তাদের কেন্দ্রের মধ্যকার দূরত্ব ২ মিটার, এবং বস্তু দুটি পরস্পরের বাইরে অবস্থিত।
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী,

এখানে মহাকর্ষীয় ধ্রুবক G-এর মান প্রায় ৬.৬৭৪ × ১০⁻¹¹ N·m²/kg²। মানগুলো বসালে পাই:
F = ৬.৬৭৪ × ১০⁻¹¹ × (১০ × ২০) / ২²
= ৬.৬৭৪ × ১০⁻¹¹ × ৫০
≈ ৩.৩৪ × ১০⁻⁹ নিউটন
অর্থাৎ, প্রতিটি বস্তু অন্যটিকে প্রায় ৩.৩৪ × ১০⁻⁹ নিউটন বল দিয়ে আকর্ষণ করে। ভর আলাদা হলেও তাদের পারস্পরিক আকর্ষণ বলের মান সমান এবং দিক বিপরীত।

এই বল অত্যন্ত ক্ষুদ্র। সাধারণ অবস্থায় মেঝে বা টেবিলের ঘর্ষণই এমন আকর্ষণের কারণে বস্তু দুটির নড়াচড়া ঠেকিয়ে দেয়। তাই দৈনন্দিন জীবনে পাশাপাশি রাখা দুটি বস্তুকে নিজেদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না। কিন্তু পৃথিবীর ভর বিপুল হওয়ায় আমাদের ওপর তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ সহজেই অনুভব করা যায়।
G ও g কি একই জিনিস?
না। বড় হাতের G হলো সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক, আর ছোট হাতের g হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ। প্রতীক দুটি দেখতে কাছাকাছি হলেও তাদের অর্থ ও একক আলাদা।
| বিষয় | G | g |
| নাম | সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক | অভিকর্ষজ ত্বরণ |
| অর্থ | মহাকর্ষ সূত্রে ব্যবহৃত একটি সর্বজনীন ধ্রুবক | শুধু অভিকর্ষের প্রভাবে কোনো বস্তুর যে ত্বরণ হয় |
| আনুমানিক মান | ৬.৬৭৪ × ১০⁻¹¹ N·m²/kg² | পৃথিবীপৃষ্ঠের কাছে প্রায় ৯.৮ m/s² |
| অবস্থান বদলালে | মান অপরিবর্তিত থাকে | মান পরিবর্তিত হতে পারে |
g ≈ ৯.৮ m/s² বলতে বোঝায়, বায়ুর বাধা উপেক্ষা করলে পৃথিবীপৃষ্ঠের কাছে মুক্তভাবে পড়তে থাকা বস্তুর নিচের দিকে বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়ে।
G ও g-এর মধ্যে সম্পর্ক কী?
পৃথিবীকে গোলীয় প্রতিসম ধরে তার পৃষ্ঠে বা বাইরে অভিকর্ষজ ত্বরণ হিসাব করা যায়:
এখানে,

- G হলো সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক।
- M হলো পৃথিবীর ভর।
- r হলো পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে সংশ্লিষ্ট স্থানের দূরত্ব।
G ও M অপরিবর্তিত থাকায় পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্ব বাড়লে g কমে। যেমন, কেন্দ্র থেকে দূরত্ব দ্বিগুণ হলে g-এর মান আগের এক-চতুর্থাংশ হয়।
মনে রাখার সহজ উপায়: G সর্বজনীন ধ্রুবক; g স্থানভেদে বদলায়।
ওপরে ছুড়ে দেওয়া বল আবার নিচে নামে কেন?
একটি বলকে ওপরের দিকে ছুড়ে দিলে হাত ছাড়ার মুহূর্তে তার বেগ থাকে ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু পৃথিবীর অভিকর্ষ বল তখনও তাকে নিচের দিকে টানে।
বায়ুর প্রতিরোধ উপেক্ষা করলে, বলটি ওপরে ওঠার পুরো সময় তার ত্বরণ থাকে নিচের দিকে। বেগ ও ত্বরণের দিক বিপরীত হওয়ায় বলটির ঊর্ধ্বমুখী বেগ ক্রমে কমতে থাকে।
সর্বোচ্চ বিন্দুতে বলটির উল্লম্ব বেগ এক মুহূর্তের জন্য শূন্য হয়। কিন্তু পৃথিবীর আকর্ষণ বা অভিকর্ষজ ত্বরণ শূন্য হয় না। তাই বলটি নিচে নামতে শুরু করে। নামার সময় বেগ ও ত্বরণ একই দিকে থাকায় তার দ্রুতি বাড়ে।
এখানে মনে রাখার বিষয় হলো: বেগ শূন্য হওয়া মানেই বল বা ত্বরণ শূন্য হওয়া নয়। সর্বোচ্চ বিন্দুতে বলটির উল্লম্ব বেগ শূন্য হলেও অভিকর্ষ তখনও কাজ করে।
চাঁদ কেন পৃথিবীর ওপর পড়ে না?
পৃথিবী যেমন ছুড়ে দেওয়া বলকে আকর্ষণ করে, তেমনি চাঁদকেও আকর্ষণ করে। আসলে চাঁদও পৃথিবীর দিকে ক্রমাগত পড়ছে। তবে তার পাশের দিকে যথেষ্ট গতি থাকায় সেটি পৃথিবীতে আঘাত না করে পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে।

বিষয়টি দুটি ধাপে বোঝা যায়:
১। পৃথিবীর মহাকর্ষ চাঁদের গতিপথ বাঁকায়। এই আকর্ষণ না থাকলে চাঁদ জড়তার কারণে সোজা পথে চলতে থাকত।
২। চাঁদের পাশের দিকে গতি তাকে সামনে এগিয়ে নেয়। ফলে পৃথিবীর দিকে পড়তে পড়তেও সেটি পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলে।
এই চলমান মুক্তপতনই কক্ষপথে ঘোরার মূল ধারণা। তাই “চাঁদ পড়ে না” বলার চেয়ে “চাঁদ ক্রমাগত পড়ছে, কিন্তু পৃথিবীতে এসে ঠেকছে না” বলা বেশি নির্ভুল।
এখানে পৃথিবীর মহাকর্ষই প্রয়োজনীয় কেন্দ্রাভিমুখী বল হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ চাঁদের গতিকে পৃথিবীর দিকে বাঁকায়। কেন্দ্রাভিমুখী বল আলাদা কোনো নতুন বল নয়; এই ক্ষেত্রে সেটি মহাকর্ষেরই ভূমিকা। কক্ষপথ বোঝাতে মহাকর্ষকে বাতিল করে দেয় এমন কোনো বাস্তব বহির্মুখী বল ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ভর ও ওজনের সম্পর্ক কী?
ভর ও ওজন এক জিনিস নয়। ভর একটি বস্তুর জড়তার পরিমাপ,অর্থাৎ তার গতি পরিবর্তন করা কতটা কঠিন, তার সঙ্গে সম্পর্কিত। আর মহাকর্ষজনিত ওজন হলো বস্তুটির ওপর মহাকর্ষের কারণে ক্রিয়াশীল বল।
শুধু স্থান বদলালে বস্তুর ভর বদলায় না। কিন্তু স্থানীয় অভিকর্ষজ ত্বরণ বদলালে তার ওজন বদলায়।
ভর ও ওজনের সম্পর্ক হলো:

এখানে,
- W = মহাকর্ষজনিত ওজন
- m = বস্তুর ভর
- g = স্থানীয় অভিকর্ষজ ত্বরণ
ধরা যাক, একটি বস্তুর ভর ১০ কিলোগ্রাম। পৃথিবী ও চাঁদের পৃষ্ঠে তার আনুমানিক ওজন হবে:
| অবস্থান | অভিকর্ষজ ত্বরণ, g | মহাকর্ষজনিত ওজন, W |
| পৃথিবীপৃষ্ঠ | ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড² | ১০ × ৯.৮ = ৯৮ নিউটন |
| চাঁদের পৃষ্ঠ | ১.৬২ মিটার/সেকেন্ড² | ১০ × ১.৬২ = ১৬.২ নিউটন |
বস্তুটির ভর দুই জায়গাতেই ১০ কিলোগ্রাম। কিন্তু চাঁদের পৃষ্ঠে অভিকর্ষজ ত্বরণ কম বলে সেখানে তার ওজন পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ।
ভরের একক কিলোগ্রাম; ওজনের একক নিউটন, কারণ ওজন একটি বল।
মহাকর্ষ নিয়ে তিনটি প্রচলিত ভুল ধারণা
দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে মহাকর্ষ সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। নিচে এমন তিনটি ধারণার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. ভারী বস্তু কি সব সময় আগে পড়ে?
না। বায়ুর প্রতিরোধ উপেক্ষা করলে একই স্থানে একই উচ্চতা থেকে স্থির অবস্থা থেকে ছেড়ে দেওয়া বিভিন্ন ভরের বস্তু একই সময়ে মাটিতে পৌঁছায়। কারণ তাদের অভিকর্ষজ ত্বরণ একই।
নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী,
a = F / m
আবার মহাকর্ষ সূত্র থেকে,
F = G × M × m / r²
তাই,

এখানে M পৃথিবীর ভর, m পতনশীল বস্তুর ভর এবং r পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্ব। হিসাবের সময় পতনশীল বস্তুর ভর m কেটে যায়। ফলে একই স্থানে ত্বরণ বস্তুর ভরের ওপর নির্ভর করে না।
ভারী বস্তুর ওপর মহাকর্ষ বল বেশি হয় ঠিকই, কিন্তু তার জড়তাও বেশি। তাই বেশি বল পেলেও সেটি শুধু ভারী হওয়ার কারণে বেশি ত্বরণে পড়ে না।
দৈনন্দিন জীবনে পালক ও পাথর একসঙ্গে পড়ে না মূলত বায়ুর প্রতিরোধের কারণে। বায়ুশূন্য পরিবেশে এই পার্থক্য থাকে না।
২. মহাশূন্যে কি মহাকর্ষ নেই?
মহাশূন্যেও মহাকর্ষ আছে। পৃথিবীর মহাকর্ষ চাঁদ ও কৃত্রিম উপগ্রহকে কক্ষপথে রাখে; সূর্যের মহাকর্ষ গ্রহগুলোর কক্ষীয় গতিতে প্রধান ভূমিকা রাখে।
পৃথিবী থেকে দূরে গেলে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ কমে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছেই তা হঠাৎ শূন্য হয়ে যায় না।
কক্ষপথে থাকা মহাকাশচারীরা ভাসেন মহাকর্ষ না থাকার কারণে নয়, বরং তাঁরা ও তাঁদের মহাকাশযান একসঙ্গে মুক্তপতনে থাকেন বলে। মহাকাশযানের মেঝে তাঁদের শরীরকে পৃথিবীর মাটির মতো ঠেলে ধরে রাখে না। তাই তাঁরা আপাত ওজনহীনতা অনুভব করেন।
৩. মাটি থেকে উচ্চতা দ্বিগুণ হলে কি ওজন এক-চতুর্থাংশ হয়?
না। ব্যস্তবর্গের নিয়মে ব্যবহৃত দূরত্ব হলো পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্ব, মাটি থেকে উচ্চতা নয়।
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ R এবং পৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা h হলে কেন্দ্র থেকে দূরত্ব:
r = R + h
তাই উচ্চতা দ্বিগুণ করলে কেন্দ্র থেকে দূরত্ব হয় R + 2h; সাধারণভাবে এটি আগের দূরত্বের দ্বিগুণ নয়।
পৃথিবীকে গোলীয় প্রতিসম ধরে এবং ঘূর্ণনের প্রভাব উপেক্ষা করলে, কেন্দ্র থেকে দূরত্ব দ্বিগুণ হলেই মহাকর্ষজনিত ওজন আগের এক-চতুর্থাংশ হয়।
যেমন, পৃথিবীপৃষ্ঠে কেন্দ্র থেকে দূরত্ব R। সেখান থেকে R উচ্চতায় উঠলে কেন্দ্র থেকে মোট দূরত্ব হয় 2R। তখন ওজন পৃথিবীপৃষ্ঠের তুলনায় এক-চতুর্থাংশ হবে।
নিউটনের সূত্র কি মহাকর্ষের শেষ কথা?
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র দিয়ে বস্তুর পতন, গ্রহের গতি এবং অনেক উপগ্রহের কক্ষপথ অত্যন্ত ভালোভাবে ব্যাখ্যা ও হিসাব করা যায়। তবে মহাকর্ষের আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা দেয় আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পদার্থ ও শক্তি স্থান-কালের জ্যামিতি বদলে দেয়। সেই জ্যামিতি মুক্তভাবে চলা বস্তুর গতিপথ নির্ধারণ করে। এভাবেই সাধারণ আপেক্ষিকতা মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে।
দুর্বল মহাকর্ষ এবং আলোর গতির তুলনায় অনেক কম গতির ক্ষেত্রে নিউটনের সূত্র সাধারণত খুব ভালো আনুমানিক ফল দেয়। কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী মহাকর্ষ বা খুব সূক্ষ্ম হিসাবের ক্ষেত্রে সাধারণ আপেক্ষিকতার প্রয়োজন হয়।
তাই মহাকর্ষ শেখার শুরুতে নিউটনের সূত্র একটি সহজ ও কার্যকর ভিত্তি।
নিষ্কর্ষ
মহাকর্ষ বল বোঝার মূল চাবিকাঠি হলো ভর ও দূরত্বের সম্পর্ক। নিউটনের সূত্র অনুযায়ী, দুটি বস্তুর ভরের গুণফল বাড়লে তাদের পারস্পরিক আকর্ষণ বাড়ে, আর দূরত্ব বাড়লে সেই আকর্ষণ দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতে কমে। পৃথিবীর অভিকর্ষ এই সর্বজনীন আকর্ষণেরই একটি বিশেষ ক্ষেত্র।
শুরুতে ছুড়ে দেওয়া বল আর চাঁদের কথায় ফিরে আসা যাক। বলের মাটিতে ফিরে আসা এবং চাঁদের পৃথিবীকে ঘিরে ঘোরা দুটির পেছনেই রয়েছে মহাকর্ষ। পার্থক্যটি তাদের গতিতে: চাঁদের পাশ বরাবর যথেষ্ট গতি থাকায় সেটি পৃথিবীর দিকে পড়তে পড়তেও পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলে। এই সম্পর্কটি বুঝলে মহাকর্ষ শুধু মুখস্থ করার একটি সূত্র থাকে না; দৈনন্দিন পতন থেকে মহাকাশের কক্ষপথ বহু পরিচিত ঘটনার ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে।






