জীবন ও কর্মে মিজানুর রহমান আজহারী: বাংলাদেশের প্রভাবশালী ইসলামিক বক্তা
বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ইসলামিক বক্তা, যিনি ধর্মীয় শিক্ষা, গবেষণা, এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ইসলাম প্রচার করছেন।

ইসলামী বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারী বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তার মনোমুগ্ধকর বক্তৃতা, কুরআন ও হাদিসের গভীর ব্যাখ্যা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের কারণে তিনি বিশেষভাবে আলোচিত। ধর্মীয় জ্ঞান ও গবেষণায় পারদর্শী এই ব্যক্তিত্ব তরুণ সমাজকে ইসলামের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তবে তার বক্তৃতা যেমন প্রশংসিত, তেমনই কিছু বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। এই আর্টিকেলে আমরা তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, শিক্ষা, বক্তৃতার ধরন, সমাজে তার প্রভাব, এবং বর্তমান অবস্থানসহ নানা দিক নিয়ে আলোচনা করবো।
মিজানুর রহমান আজহারীর জন্মস্থান ও বেড়ে ওঠা
মিজানুর রহমান আজহারী জন্মগ্রহণ করেন ২৬ জানুয়ারি ১৯৯০ সালে ঢাকার ডেমরায়। তার মূল বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরের পরমতলা গ্রামে ও পুরো নাম মিজানুর রহমান। তবে তিনি “আজহারী” উপাধি লাভ করেন মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সুবাদে। মিজানুর রহমান আজহারী ধর্মপরায়ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে ইসলামিক শিক্ষা ও নৈতিকতার চর্চা গুরুত্ব পেত। তার বাবা একজন মাদ্রাসার শিক্ষক, যিনি পরিবারের সদস্যদের ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনে উৎসাহিত করতেন। পরিবারে তার মা, বাবা ও এক ভাই রয়েছেন।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা
শৈশব থেকেই মিজানুর রহমান আজহারী ছিলেন মেধাবী ও জ্ঞানপিপাসু। তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় নিজ গ্রামের মাদ্রাসায়, যেখানে তিনি কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকার দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদরাসায় (ডেমরায় অবস্থিত) ভর্তি হন এবং কওমি ধারার ইসলামিক শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষায়ও পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
তিনি ২০০৪ সালে দাখিল পরীক্ষায় সর্বোচ্চ জিপিএ অর্জন করে উত্তীর্ণ হন এবং ২০০৬ সালে আলিম পরীক্ষায়ও অসাধারণ ফলাফল লাভ করেন। উভয় পরীক্ষায় তার কৃতিত্ব তাকে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ মেধাবীদের তালিকায় স্থান করে দেয়। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি ধর্মীয় জ্ঞান ও গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান, যা পরবর্তী সময়ে উচ্চতর ইসলামিক শিক্ষার পথে তার অগ্রযাত্রাকে আরও দৃঢ় করে।
মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা
মাধ্যমিক পর্যায়ে চমৎকার ফলাফল করার পর তিনি ২০০৭ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত মিশর সরকারের স্কলারশিপ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেন। এটি বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে কুরআন, হাদিস, ইসলামিক আইন (ফিকহ) এবং অন্যান্য ধর্মীয় বিষয়ে গভীর গবেষণা পরিচালিত হয়।
২০১২ সালে তিনি অনার্স সম্পন্ন করেন। মিশরে পড়াশোনার সময় তিনি তাফসির, হাদিস, ইসলামিক ফিকহ, আরবি সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইসলামিক গবেষকদের সংস্পর্শে আসেন এবং ইসলামের আধুনিক গবেষণা ও দার্শনিক দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
মালয়েশিয়ায় এমফিল ও পিএইচডি

মিশরে উচ্চশিক্ষা শেষে ২০১৩ সালে তিনি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া (IIUM) থেকে ইসলামিক স্টাডিজ ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। সেখানে তিনি গ্র্যাজুয়েশন শেষে এমফিল এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার এমফিল গবেষণার বিষয় ছিল ‘Human Embryology in the Holy Quran’।
এমফিল সম্পন্ন করার পর, তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হন এবং ২০২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ‘Human Behavioral Characteristics in the Holy Quran and an Analytical Study’ বিষয়ে গবেষণা সফলভাবে শেষ করেন।
মিজানুর রহমান আজহারীর দাম্পত্য জীবন ও জীবনদর্শন
ড. মিজানুর রহমান আজহারীর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে অনেকেই কৌতূহলী, কারণ তিনি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা। যদিও তিনি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গণমাধ্যমে খুব বেশি শেয়ার করেন না, তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে তার পরিবার, শখ ও জীবনদর্শন সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। মিজানুর রহমান আজহারী বিবাহিত এবং তার স্ত্রী একজন ধর্মপরায়ণ নারী। ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি এবং তাদের দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
মিজানুর রহমান আজহারীর জীবনধারা অত্যন্ত পরিশীলিত ও ইসলামী নীতিনৈতিকতার উপর ভিত্তি করে গঠিত। তার শখ ও জীবনদর্শনেও এই বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়। তিনি ইসলামী বই পড়তে ভালোবাসেন, বিশেষ করে কুরআন ও হাদিস বিষয়ক গবেষণা তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। ভ্রমণ তার অন্যতম শখ। শিক্ষা ও গবেষণার কাজে বিভিন্ন দেশ সফর করলেও, ইসলাম প্রচার ও গবেষণার জন্য তার এসব সফর বেশ অর্থবহ হয়ে ওঠে।
মিজানুর রহমান আজহারীর লেখা গ্রন্থসমূহ
ড. মিজানুর রহমান আজহারী ইসলামী শিক্ষার গভীরতা ও আধুনিক বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার লেখাগুলো কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে বাস্তব জীবনের সমস্যা ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করে, যা পাঠকদের আত্মউন্নয়ন ও ধর্মীয় জ্ঞানের বিকাশে সহায়তা করে। নিচে তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো দেওয়া হলো:
মিজানুর রহমান আজহারীর পাঁচটি জনপ্রিয় ওয়াজ
মিজানুর রহমান আজহারীর ওয়াজগুলো কুরআনের গভীর তাফসীর, বাস্তব জীবনের শিক্ষা ও ঈমান জাগানিয়া কথামৃত দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। তার বয়ানে কুরআনের বাণী, নবীজির (সা.) জীবন থেকে অনুপ্রেরণা এবং পরকালীন জীবনের প্রস্তুতির গুরুত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। নিচে তার পাঁচটি জনপ্রিয় ওয়াজের তালিকা দেওয়া হলো, যা আপনাকে আত্মশুদ্ধি ও ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করবে।
#১ মিজানুর রহমান আজহারী এক গরীব সাহাবীর হৃদয়বিদারক ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে নিজেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এই নতুন ওয়াজে তিনি মহানবী (সা.) -এর সময়কার একটি ঘটনা তুলে ধরেন, যা ধৈর্য, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের অনুপ্রেরণা দেয়।
#২ এই ওয়াজে মিজানুর রহমান আজহারী কেয়ামতের ভয়াবহতা ও সেদিনের কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। মানবজাতির পরিণতি, হিসাব-নিকাশের কঠিন মুহূর্ত এবং নেক আমলের গুরুত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেতে পুরো ওয়াজটি শুনুন।
#৩ আল্লামা সাঈদীর স্মৃতিময় প্যারেড মাঠে আয়োজিত বিশাল মাহফিলে মিজানুর রহমান আজহারী কুরআনের আলোকে দীন, আখিরাত ও জীবনবিধান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। তাফসীরুল কুরআনের এই মাহফিলে লাখো শ্রোতার উপস্থিতি এক অনন্য মুহূর্ত তৈরি করে।
#৪ চাঁপাইনবাবগঞ্জে অনুষ্ঠিত শেষ মাহফিলে লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল, যেখানে ড. মিজানুর রহমান আজহারীর বক্তব্য নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে। হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এই ওয়াজ শুনতে পুরো ভিডিওটি দেখুন।
#৫ রমজান মাস আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়। এই বিশেষ ওয়াজে প্রখ্যাত ইসলামিক বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী তুলে ধরেছেন রমজানের তাৎপর্য, রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও কুরআনের আলোকে একজন মুসলমানের করণীয়।
বাংলাদেশের প্রভাবশালী ইসলামি বক্তা হয়ে ওঠার গল্প
মিশর ও মালয়েশিয়ায় দীর্ঘ শিক্ষা ও গবেষণা শেষে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং ইসলামী বক্তা হিসেবে ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করেন। তার বক্তৃতার ধরন ছিল অনন্য, সুনির্দিষ্ট গবেষণার ওপর ভিত্তি করে যৌক্তিক, আকর্ষণীয় ও আধুনিক উপস্থাপনশৈলী।
তার বক্তৃতার বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা: তিনি জটিল ধর্মীয় বিষয়গুলো সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য হয়।
- বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা: তিনি ইসলামিক বিষয়গুলোকে আধুনিক বিজ্ঞান ও বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা করেন।
- তরুণদের প্রতি আকর্ষণীয় উপস্থাপনা: তার বাচনভঙ্গি, যুক্তিপূর্ণ আলোচনা, এবং সমসাময়িক প্রসঙ্গ যুক্ত করার কারণে তরুণদের মধ্যে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
- প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী প্রসঙ্গ: তিনি বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যা, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধন, নৈতিকতা, এবং প্রযুক্তির যুগে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত, এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেন।
- আরবি ও ইংরেজি ভাষার দক্ষতা: তিনি আরবি ভাষায় পারদর্শী, যা তাকে ইসলামের মূল পাঠ্যসূত্র থেকে নির্ভুল তথ্য উপস্থাপনের সুযোগ করে দেয়। এছাড়া, তিনি ইংরেজি ভাষাতেও দক্ষ যা তাকে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের সামনে ইসলামের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে সহায়তা করে।
- নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা: শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ নয়, বরং তরুণদের নৈতিক শিক্ষা, দায়িত্বশীলতা, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে সচেতন করেন।
তার বক্তৃতাগুলো দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে থাকে। ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে তার ওয়াজ লাখ লাখ দর্শক গ্রহণ করতে শুরু করে। তিনি শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য মুসলিম কমিউনিটিতেও পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
বক্তৃতায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন
মিজানুর রহমান আজহারীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তিনি ইসলামের ব্যাখ্যায় আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের সংযোজন করেন। অনেক বক্তা যেখানে কেবল ঐতিহ্যগত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেন, সেখানে তিনি বিজ্ঞানের আলোকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করেন।
কিছু উদাহরণ:
- কুরআনের আয়াতগুলোর সঙ্গে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, মানবদেহের গঠন এবং সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণার মিল খুঁজে বের করে তা যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করেন।
- আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও সামাজিক গবেষণার ভিত্তিতে ইসলামের নৈতিকতা ও আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন।
- প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেন।
তার এই ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং ইসলামের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে।
ইসলাম প্রচারে ভূমিকা
মিজানুর রহমান আজহারী ইসলামের শান্তিপূর্ণ বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নানা মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি কেবল প্রচলিত ওয়াজ মাহফিলে সীমাবদ্ধ না থেকে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এবং আন্তর্জাতিক ইসলামিক সম্মেলনের মাধ্যমে তার বার্তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
- সাম্প্রতিক ইসলামিক গবেষণা ও ব্যাখ্যা: তিনি ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে আধুনিক গবেষণার আলোকে সহজ ও যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা তুলে ধরেন, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য।
- ডিজিটাল ইসলাম প্রচার: ইউটিউব, ফেসবুকসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে তার ভিডিও লাখো মানুষ দেখে, যা ইসলামিক জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
- বাংলা ভাষায় ইসলামিক শিক্ষার প্রচার: তিনি ইসলামের মৌলিক ও গভীর বিষয়গুলো বাংলায় ব্যাখ্যা করেন, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে তা বুঝতে পারে।
মিজানুর রহমান আজহারীর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া
মিজানুর রহমান আজহারীর ওয়াজ মাহফিল ও বক্তৃতায় সাধারণত কুরআন ও হাদিসভিত্তিক আলোচনা উঠে আসে, যা অধিকাংশ মানুষ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। তবে কিছু বক্তব্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- ধর্মান্তরিত করা এবং গণমাধ্যমে সমালোচনা: ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ১২ জন ভারতীয় হিন্দু নাগরিক অবৈধ ভাবে বাংলাদেশে থাকাকালীন মিজানুর রহমান আজহারীর হাতে ধর্মান্তরিত হয়। জানা যায় তারা বাংলাদেশের নাগরিক সনদও তৈরি করে অবৈধভাবে, ফলে ঘটনাটি সমালোচনার জন্ম দেয়।
- দেশবিরোধী মন্তব্যের অভিযোগ এবং মাহফিল নিষিদ্ধ হওয়া: তার কিছু মন্তব্যের জন্য তাকে দেশবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে এক সাংসদ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে তার মাহফিল একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়। তবে অনেকেই এগুলোকে তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে মনে করেন।
- যুক্তরাজ্যে প্রবেশে বাধা ও ভিসা বাতিলের মামলা: ২০২১ সালের অক্টোবরে মিজানুর রহমান আজহারী যুক্তরাজ্যে ইসলামি কনফারেন্সে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের হোম অফিস ধর্মীয়ভাবে অন্য ধর্মকে আঘাত করা এবং ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগে তার ভিসা বাতিল করে এবং আদালতও তার বিপক্ষে রায় দেয়।
- যশোরে তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে বিতর্কিত মন্তব্য: ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, তিনি যশোরে এক তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে “একদল খেয়েছে, আরেক দল খাওয়ার জন্য রেডি হয়ে আছে” মন্তব্য করেন, যারাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তার এই বক্তব্য বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দুর্নীতির প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে।
দেশত্যাগ, প্রবাস জীবনের প্রেক্ষাপট ও প্রত্যাবর্তন
মিজানুর রহমান আজহারী এক সময় বাংলাদেশে নিয়মিত ওয়াজ মাহফিল করলেও, হঠাৎ করেই ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি দেশ ছাড়েন। এই দেশত্যাগ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা রয়েছে, যেমন:
- সুযোগসুবিধা ও উচ্চশিক্ষার কারণ: তিনি দাবি করেন, তার বিদেশে অবস্থানের মূল কারণ ইসলামিক উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং গবেষণা করা।
- রাজনৈতিক চাপ ও বিরোধিতা: তবে অনেকে মনে করেন, তার বক্তব্যের কারণে তিনি রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়েন এবং বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়েন। তিনি নিজে উল্লেখ করেন “পারিপার্শ্বিক কারণে এবং গবেষণার জন্য” বাইরে যাচ্ছেন।
- প্রবাস জীবন ও ইসলাম প্রচার: এই সময়ে তিনি বিভিন্ন দেশে ইসলাম প্রচার ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকদের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন।
- দেশে প্রত্যাবর্তন: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর ২ অক্টোবর আজহারী পুনরায় দেশে ফিরে আসেন।
নিষ্কর্ষ
মিজানুর রহমান আজহারী একজন আধুনিক ইসলামী বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন, যিনি ধর্মীয় জ্ঞান এবং যুক্তির সংমিশ্রণ মাধ্যমে তরুণ সমাজের মধ্যে ইসলামের সঠিক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তার বক্তৃতা এবং ইসলামিক গবেষণার আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। যদিও কিছু বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছেন, তার কাজ এবং সমাজে প্রভাব গভীরভাবে প্রশংসিত। ইসলামের শান্তিপূর্ণ বার্তা প্রচারে তার অবদান অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং তার কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে আরও বহু মানুষকে ইসলামের সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করবে।
Images Credit: Facebook